কথায় আছে আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত। যে শিশু আজ পিতা-মাতার আশুয়ে আছে সময়ের পরিবর্তনে সে শিশুই একদিন বয়স্ক পিতা-মাতার একমাত্র আশ্রয়স্থল। উন্নত বিশ্বের কথা আলাদা। Read in English

উন্নত বিশ্বে বয়স্ক পিতা-মাতার ভরণপোষণ, চিকিৎসা সেবা থেকে শুরু করে সমস্ত দায়-দায়িত্বই রাষ্ট্র বহন করে থাকে। আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে সে ব্যবস্থা এখনো গড়ে উঠেনি, তবে ভবিষ্যতে যে গড়ে উঠবে না। তা বলা যাবে না, কারণ পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে যৌথ পরিবার ভেঙ্গে ছোট ছোট পরিবারে রুপ নিচ্ছে, ফলে পারিবারিক বন্ধন ক্রমাম্বয়ে ভেঙ্গে ছিন্ন-বিচ্ছিনয়ে পড়ছে। তারপরও খুশির খবর হলো বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে পারিবারিক বন্ধনের দেশ হিসাবে সুখী দেশ, যা আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে।

বাংলাদেশে এখনো অনেক যৌথ পরিবার দেখা যায়, আর যৌর পরিবারের বন্ধন থাকে অটুট, ফলে পারিবারিক মায়া মমতা সেতু ভালবাসা থাকে অপরিসীম। আর এই কারণেই সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধনের দেশ বাংলাদেশ। আমার এক বন্ধু কয়েক বৎসর পূর্বে একটি আন্তর্জাতিক সেবা সংগঠনের অস্ট্রেলিয়ায় যায়। সেখানে সম্মেলনস শেষে সে দেশের আত্ম সেবা মানবতার কার্যক্রম দেখার জন্য একটি বৃদ্ধাশ্রম পরিদর্শনে যান। অস্ট্রেলিয়ার সেবার ধরনটা একটু আলাদা, যেমন দেখা গেল একজন গরীব বৃদ্ধ দম্পতি বাড়ীতে সাদা- কালো টেলিভিশন দেখছে, সেখানে সেবা করতে চাইলে সাদা-কালো টেলিভিশনটা নিয়ে একটা কালার টেলিভিশন বৃদ্ধের বাড়িতে দিয়ে সেবা করা হলো।

শিশু শ্রম কি? এবং কেন?

যাই হোক বন্ধুটি বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে দেখতে পারেন প্রায় ৮০ বৎসর বয়স্ক এক বৃদ্ধ আনন্দে আত্মহারা হয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। অনেকক্ষণ চেষ্টার পরে জানতে পারেন বৃদ্ধর এত উৎফুল হওয়ার কারণ কি ? বৃদ্ধর একমাত্র পুত্র সেদেশেরই অন্য একটি প্রদেশে থাকে, প্রায় দুই বৎসর পর বৃদ্ধর পুত্র বৃদ্ধকে দেখার জন্য আসছে, আর সেই সংবাদ পেয়ে বৃদ্ধ আনন্দে আতাহারা হয়ে পড়েছে, অথচ আমাদের দেশে অধিকাংশ পরিবারই শুধু বৃদ্ধ পিতা-মাতা নহে, বৃদ্ধ দাদা-দাদি, বিধবা বোন, ফুফু পর্যন্ত এক অল্পে থেকে খেয়ে না খেয়ে পারিবারিক মায়া মমতায় জড়াজড়ি করে বসবাস করে যে কথা বলছিলাম, শিশু শ্রম নিয়ে। শিশু শ্রম নিয়ে কথা বলতে গেলে আইনের দৃষ্টিতে কে বা কারা শিশু সে সম্পর্কে আমাদের প্রাথমিক জ্ঞান থাকা দরকার। ১৯৭৪ সনের চিলড্রেন এ্যাক্ট এর বিধান মোতাবেক ১৪ বৎসরের নিচের কোন বালক বা বালিকাকে নাবালক বা শিশু বলা হতো ২০১৩ সনের শিশু আইন অনুযায়ী ১৮ বৎসরের বয়সের নিচে কোন ব্যক্তি শিশু। ১৮৯০ সালের GUARDIAN AND WARDS ACT এর বিধান মোতাবেক ২১ বৎসরের নিচে কোন ছেলে এবং ১৮ বৎসরের নিচে কোন মেয়ে নাবালক নাবালিকা।

কেন শিশু শ্রম বন্ধ করা প্রয়োজন?

আর নাবালক নাবালিকারাই শিশু হিসাবে গণ্য। নাবালক নাবালিকা কোন ছেলে-মেয়েকেদিয়ে কোন শ্রমিকের কাজ করা যাবে না। এরূপ কোন কাজ করানো হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলওর) বিধান মতেও শিশু শ্রম আইনতঃ নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সনদে মূলতঃ ১৪ বৎসরের বয়সের নিচের কোন শ্রমিককেই শিশু শ্রমিক হিসাবে গণ্য করেছেন। আর শিশু শ্রমিককে দিয়ে কাজ করানো শ্রম আইনের পরিপন্থি। মজার ব্যপার হলো বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশ ও বিশ্বের অনুন্নত দেশ ছাড়াও অনেক উন্নত দেশে শিশুদের বিপদজ্জনক কাজে শ্রমিক হিসাবে লাগানো হয়। আইএলওর এক সম্মেলনে বলা হয় বিশ্বের বড় বড় ২৮টি প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকই নিকেল জাতীয় ধাতু উত্তোলনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের ব্যবহার করছে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১৫ কোটি ২০ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে, তাদের মধ্যে ২ কোটি ৫০ লাখ শিশুকে জোর করে বিপজ্জনক কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। ব্রিটিশ মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল টাইম টু রিচার্জ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন বিশ্বের বড় বড় ২৮টি কোম্পানী শিশুদের নিকেল উত্তোলনের কাজে ব্যবহার করা হয়।বহু নামী দামী প্রতিষ্ঠানেও শ্রমিক শিশু রয়েছে।

শিশু শ্রম এর কারণে ক্ষতি

তারা আরো জানায় ঐ সকল শিশু শ্রমিক দ্বারা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হয় যাহা শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মারাত্মক এক পরিসংখ্যানে জানা যায় বাংলাদেশে প্রায় ৪.৭ মিলিয়ন শিশু শ্রমিক বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছে। জাহাজ ভাঙ্গা থেকে শুরু করে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু শ্রমিকদের ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে আবার শতকরা ৮৩% শিশু শ্রমিক গ্রামাঞ্চলে এবং ১৭% শিশু শ্রমিক শহরের বিভিন্ন কল কারখানা সহ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছেন। মূলতঃ বাংলাদেশের শিশু শ্রমিক গুলো পারিবারিক অভাব অনটনের এবং অশিক্ষা ও সচেতনার অভাবে তারা শ্রমিক হিসাবে কাজে যোগদান করে। এই শিশু শ্রমিকগুলো অনেক সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

করোনার কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় কিছুদিন পূর্বে ঢাকায় কয়েকজন স্কুলগামী শিশু একটি কারখানায় কাজ নেয়। দূর্ভাগ্যক্রমে ঐ কারখানায় আগুন লেগে অন্যান্য শ্রমিকদের সঙ্গে স্কুলগামী শিশুগুলো প্রাণ হারায়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। একটি সুখী সমৃদ্ধ জাতি বিনির্মানে সুনাগরিক প্রয়োজন, আর আজকের শিশুই আগামী দিনের সুনাগরিক। তাই সরকারিভাবে শিশু শ্রম বন্ধ করে শিশুদের স্কুলমুখী করে গড়ে তোলা দরকার। ভবিষ্যতে একটি সুখী সমৃদ্ধ জাতি গড়ার লক্ষ্যে শিশুদের যে ভাবে গড়ে তোলার দরকার আসুন আমরা সেভাবেই শিশুদের গড়ে তুলি। আর আজকের দিনের এই অঙ্গীকার হোক সরকারি বেসরকারি সবার।

লেখক : এড. মোঃ মোজাম্মেল হক, আইনজীবী, বগুড়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published.